মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এই কি হাল!!

১৯৭১ পৃথিবীর বুকে এঁকে দেয়া একটি লাল সবুজের বিশ্বজয়ের বছর।
৭১ কেড়ে নিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের ৩০ লক্ষ তাজা প্রাণের রক্ত আর দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জত।
৭১ জীবন বাজি রেখে লড়াই করতে শিখিয়েছে পৃথিবীর মানুষকে,সে লড়াইয়ে পঙ্গু হয়ে এখনো বেঁচে আছে অনেক মানুষ।
৭১ এ সরকারী বেসরকারী সেনা পুলিশ কৃষক শ্রমিক ছাত্র মজুর এক সাথে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছেন ৯ মাসে।
সেই ইতিহাসের জনক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমানে বাংলাদেশ।
এমন বীরুচিত ইতিহাস পৃথিবীতে কোন দেশের নেই।
আমাদের ধমনীতে সেই রক্ত বয়ে বেড়াচ্ছে যেই রক্ত অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে শেখায়নি।

আমরা সেই জাতি যেই জাতি গৌরব উজ্জ্বল নিদর্শন তৈরি করতে বুক পেতে জীবন উৎসর্গ করে দেয়েছিল তবু শক্রুর সাথে আপোষ করেননি।

আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা,আমাদের রক্তের বিনিময়ে কেনা স্বাধীনতা,আমাদের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা,আমাদের পঙ্গুত্বর বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা নিশ্চয়ই গর্বের ও হৃদয়ে মননে লালন করার মতো।

অথচ ৪৯ বছর কেটে গেল আমরা গর্বিত হওয়ার বদৌলতে আত্মঅহংকারী হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া তৎকালীন বীর যোদ্ধাদের মান মর্যাদা আর কাঙ্ক্ষিত পথটা ধরে রাখতে পারিনি।
খবরের কাগজে যখন দেখি স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া একজন পৃথক বীর জোতা সেলাই করে, আইসক্রিম বিক্রি করে,ভিক্ষা করে,অবহেলা অনাদরে ধুঁকে ধুঁকে মরছে তখন আর স্থির থাকতে পারিনা।
এই জন্যই স্থির থাকতে কষ্ট হয়!
আমরা তো শুনেছি ও দেখেছি স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী রাজাকার আল বদর আল শামস বাহিনীর সদস্যরা কিভাবে লাল সবুজের পতাকা লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন!!

আমরা তো দেখেছি তাদের ছেলে সন্তানরা কিভাবে রাষ্ট্রীয় গতিপথ পরিবর্তন করে কোটিপতি হয়ে আরাম আয়েশ করছে!!

এটাও তো দেখেছি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা কারীদের হাতে কিভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন!!

আফসোস!
দিনে দিনে এই ৪৯ বছরে রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে এই স্বাধীনতা বিরোধীদের অবস্থান পোক্ত হয়েছে।
দেশ স্বাধীনের মুল মন্ত্র থেকে ক্রমান্বয়ে সরকার ও সরকারি কাঠামোতে অপপ্রচার করা হয়েছে,আস্তে আস্তে ভীত নষ্ট করে দেয়া হয়েছে।

আমরাও বিভিন্ন চেতনাবাজদের খপ্পরে পড়ে সত্যের আড়ালে মিথ্যার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে গেছি।
এই চেতনাবাজরা অফিস আদালত থানা, রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ময়দানে নিজেদেরকে মহা পন্ডিত বনে যেতো,আর কিছু চেলা ফেলা দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চেষ্টা করেছেন,পৃথক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঐতিহ্য পরের প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা থেকে বিচ্যুত করেছেন বছরের পর বছর।

যার ফলশ্রুতিতে জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থান নষ্ট হয়েছে স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছি।
স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারীরাও কালের পরিক্রমায় নিমুজ্জিত হয়ে যায়।

খুবই দুঃখজনক হলেও সত্য সারাদেশের ন্যায় আমার নিজ উপজেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরেও কি তার ব্যতয় ঘটেছে ?
ঘটেনি।

মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন অনেক বীর বাহাদুর।
আমি ব্যক্তিগত ভাবে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
সেই সাথে নিজের কাঁধে সেই ব্যর্থতার দায়ও স্বীকার করে নিচ্ছি।
সেই দায় কি এড়ানোর সাধ্য আমার আছে ?
আর কি ভাবে সেই দায় এড়াতে পারি বলুন তো ??

আমরা কি নবীনগরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অংশগ্রহণ করা সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারের গেজেটভুক্ত হয়েছে কিনা নাকি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়ে অমুক্তিযোদ্ধা গেজেটভুক্ত হয়েছে কিনা সেই সংবাদ বা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রকাশ করতে পেরেছি ?
পারিনি।

যাদের বীরুচিত ত্যাগে আমরা নবীনগরবাসী গর্বিত বা সম্মানীত হওয়ার কথা সেই সুর্য সন্তানদের মূল্যায়ন করতে পেরেছি।
তাদের কোন খোঁজ খবর নিয়েছি।

যদি নিয়েই থাকি তবে কি করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা নবীনগরের বীর পুলিশ সদস্য জাতীয় খেতাবপ্রাপ্ত বীরবিক্রম আব্দুল মান্নান এর সমাধি সেই চট্টগ্রামে অযত্নে ৪৯ বছর রইলো ?

নবীনগরে উনার নামের প্রতি সুবিচার করতে গিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান বা রাস্তাঘাটের নামকরণও তো করতে পারলাম না আমরা।
আরো পরিতাপের বিষয় হলো ৪৯ বছরে নবীনগরবাসীর কাছে অজানাই রয়ে গেল উনার বীরুচিত ত্যাগ।

আমরা কতটুকু দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছি তা কি একবারও ভাবা যায় ?
এতো বছর যাবৎ নবীনগরে স্বাধীনতা দিবস,বিজয় দিবসগুলোতে এতো চেতনার লম্বা লম্বা বক্তৃতা আর স্মৃতিচারণ করা হয় অথচ সেখানে একবারও বীরবিক্রম আব্দুল মান্নান ছিল কিনা আমার জানা নেই।

একটা মানুষ দেশের জন্য শহীদ হলেন রাষ্ট্র তাকে বীরবিক্রম খেতাব দিলেন,দেশের ৬ জন খেতাবপ্রাপ্ত পুলিশের একজন অথচ তাকে নিয়ে নবীনগরের আমরা সাংবাদিক রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক এমনি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তেমন কোন তথ্য নেই,আলোচনা নেই,প্রচার প্রচারণা কিছুই নেই।
অথচ তিনি পড়ে থাকলে অযত্ন অবহেলায় সুদূর চট্টগ্রামে।

নবীনগরে এতো এতো সরকারি যায়গা দখল বেদখল  হয়েছে,মার্কেট তৈরি হয়েছে কিন্তু এই বীর শহীদদের জন্য একটা স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করার উদ্যোগ কেউ নিতে পারেনি।
কেউ সেই চিন্তা ভাবনাও করেনি।
কারো কলমের খোঁচায় এক লাইন লেখা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

তারচেয়েও বেশি হতভাগ হলাম শহীদ এই পরিবারের সদস্যদের মনোভাব দেখে।
তারা কি করে এতো দিন নিরব ছিলেন ?
কেন তারা এই বিষয়ে একটি দৃষ্টিনন্দন কার্যক্রম পরিচালনা করেননি।

এটাই কি মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আমাদের সম্মান ?
এই কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা!
এই চেতনায় উজ্জীবিত হয়েই কি আমরা আগামীর নবীনগর গড়তে চাই ?
লজ্জায় আমার মাথা হেড হয়ে এলো।
কোন মুখে বড় কথা বলি!

কতটুকু দায়বদ্ধতা থেকে সমাজ সংস্কৃতির সংস্কারক হিসেবে দাবী করি!
আমরা যাদের ত্যাগের মূল্যায়ন করতে ৪৯ বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিলাম সেই ঘুমন্ত আমাদের সন্তানরা কি কারণে আমাদের এক বছর মনে রাখবে বলতে পারেন ???

ক্ষমা করো হে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান!
বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি আপনাকে
তোমার অভিশাপ থেকে আমাদের মুক্তি দাও।

লেখকঃ এম কে জসিম উদ্দিন

সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী