জন্মের পর একবারই সন্তানকে দেখেছেন করোনাযোদ্ধা ডা. সাইফ

হাওরবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন ডা. মো. সাইফুল ইসলাম সাইফ। সেজন্য ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়েছে তাকে। তবে কোয়ারেন্টাইনের এই সময়টাতেও মুঠোফোনে দাফতরিক সব কাজ করে গেছেন তিনি। মাত্র দেড় মাসের সন্তান রেখে কাজ করে যাচ্ছেন এই করোনাযোদ্ধা। মানুষকে সচেতন করা, নমুনা সংগ্রহ, আইসোলেশন ওয়ার্ড তদারকি ও রোগী দেখাসহ আনুষাঙ্গিক সব কাজই করতে হচ্ছে ডা. সাইফকে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আসাবিক চিকিৎসক সাইফ করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিজের পাশাপাশি জুনিয়র চিকিৎসক ও নার্সদের কাজে উৎসাহ যোগাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত নাসিরনগর উপজেলায় ১৬৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে।

ডা. সাইফের পৈত্রিক নিবাস কুমিল্লা জেলায় হলেও বর্তমানে পরিবার নিয়ে ঢাকার বনশ্রীতে বসবাস করেন। দুই ছেলে সন্তানের জনক তিনি। বড় ছেলে রাইয়াত আল ইসলাম আজরাফের বয়স সাড়ে তিন বছর আর ছোট ছেলে রাইয়ান আল ইসলাম আরহামের বয়স দেড় মাস। নিজের জন্য ভয় না হলেও পরিবার নিয়ে অজানা ভয় কাজ করে সাইফের মনে। তবুও করোনা যুদ্ধে নিজেকে সপে দিয়েছেন দেশ ও দেশের মানুষের তরে।

সাইফ জানিয়েছেন, গত ৪ এপ্রিল নাসিরনগর উপজেলায় প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী (৩৫) জ্বর নিয়ে তার চেম্বারে আসেন। তিনি মালয়েশিয়া থেকে গত ১৮ মার্চ দেশে ফেরেন এবং তার কাশি ছিল। কিন্তু তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন। পরবর্তীতে তাকে কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষা করানো হয়। এরপর ৭ এপ্রিল তিনি মারা যান। পরবর্তীতে নমুনা সংগ্রহ করার পর ১২ এপ্রিল তার রিপোর্ট করোনা পজিটিভ আসে। তার মাধ্যমে তার পরিবারের আরও ৪ সদস্যের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে।

তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই টানা কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। রাত-বিরাতে যখনই ফোন আসে তখনই ছুটে যান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
তার মতে, তিনি যদি করোনার ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেন তাহলে জুনিয়র চিকিৎসক-নার্সরা কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেবেন। আর তাই নানাভাবে মনে সাহস যুগিয়ে তাদের মনোবল চাঙ্গা রাখছেন তিনি।

তিনি বলেন, পরিবারে আমার মা, স্ত্রী এবং দুই ছেলে আছে। ছোট ছেলের বয়স দেড় মাস। জন্মের সময় একবার গিয়ে দেখে আসার পর আর যেতে পারিনি। মাঝে মধ্যে স্ত্রী-সন্তানদের কথা চিন্তা করে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু করোনায় এত মানুষের আক্রান্ত ও মৃত্যুর কথা মনে করে স্ত্রী-সন্তানের কথা ভুলে থাকি। এই সময়টাতে মানুষের সেবা করাই আমার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। একা থাকার কারণে কখন কী হয় সেজন্য বাসার সবাই আমাকে নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকে। চাইলে আমিও বাড়িতে চলে যেতে পারতাম, কিন্তু সেটা করিনি। কারণ দেশের এই দুর্যোগে আমাদের ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই।

এই পেশায় আসার সময় আমরা শপথ নিয়েছিলাম দেশ মাতৃকার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেব। সেজন্য আমরা কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারছি না। আমি যেহেতু আবাসিক চিকিৎসক সেজন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকার সময়টাতেও ঘরে বসে মুঠোফোনে সব কাজ করে গেছি। আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অভিজিৎ রায় ও আমাকেই করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে রোগীকে আইসোলেশনে রাখাসহ সার্বিক বিষয়গুলো তদারকি করতে হচ্ছে। আমি এবং জুনিয়র চিকিৎসক-নার্সরা যেন ভেঙে না পড়েন তাই তাদের মনোবল চাঙা রাখতে ডা. অভিজিৎ রায় আমাদের কাজে উৎসাহ দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচ শয্যার একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড রয়েছে। করোনায় মারা যাওয়া ওই প্রবাসীর পরিবারের চার সদস্য করোনা পজিটিভ হওয়ার পর তাদেরকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু হাওরাঞ্চল হওয়ায় তাদেরকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেফার্ড করা হয়েছে। নাসিরনগরে করোনা নিয়ে কাজ করাটা কিছুটা চ্যালেঞ্জের। এখানে মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনা অনেক কম। তবে আমরা মানুষের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তন করে করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করছি। এখানকার প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কাজগুলো করছি।

নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা যেন ভয় না পাই সেজন্য আমাদের নানাভাবে উৎসাহ দিচ্ছেন ডা. সাইফ। নিয়মিত আমাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন করোনা পরিস্থিতি ও রোগীদের সেবা নিয়ে। করোনা রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করার জন্যও আমাদের সঙ্গে যান তিনি। কোনো রোগী করোনা পজিটিভ হলে তাকে আইসোলেশনে রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও তিনি করছেন।

এ ব্যাপারে নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অভিজিৎ রায় বলেন, করোনার এই সময়ে দেড় মাসের সন্তান রেখে ডা. সাইফুল যে এখানে পড়ে আছেন এটাই বিষ্ময়কর। এখনও তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নমুনা সংগ্রহ করছেন এবং রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তার নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। দুইবার নমুনা পাঠানোর পর দুইবারই রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।